
আজ ১৮ আগস্ট, ঐতিহাসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর ও উলুউড়ি গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে জমিদারি ও নানকার প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানের ইপিআর বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে পাঁচ কৃষক নিহত হন। এর প্রায় ১৫ দিন আগে একই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রজনী দাস জমিদারের লাঠিয়ালদের হামলায় নিহত হন। নানকার আন্দোলনে মোট ছয়জন কৃষকের আত্মত্যাগের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নানকার কৃষক আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত ও নানকার প্রথা রদ করে। একই সঙ্গে নানকার কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি পাওয়ার পথও তৈরি হয়।
‘নান’ শব্দের অর্থ রুটি। জমিদারের দেওয়া সামান্য জমি ও বসতভিটা ভোগের বিনিময়ে বিনা মজুরিতে জমিদারের বাড়িতে কাজ করতে হতো নানকারদের। জমি ও বাড়ি ব্যবহার করলেও সেগুলোর ওপর তাঁদের কোনো মালিকানা ছিল না। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত এই ব্যবস্থা কৃষকদের জীবনে দীর্ঘদিনের শোষণ ও নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯২২ সাল থেকে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় নানকার প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলন শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন সংগঠিত হয়। বিয়ানীবাজারের লাউতা-বাহাদুরপুর এলাকায় জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিরোধও ধীরে ধীরে জোরদার হতে থাকে। একপর্যায়ে কৃষকেরা খাজনা দেওয়া বন্ধসহ বিভিন্নভাবে জমিদারদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা শুরু করেন।
১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ভোরে সানেশ্বর এলাকায় সরকারি বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে সানেশ্বর ও উলুউড়ি গ্রামের নানকার কৃষকেরা সুনাই নদীর তীরে জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কৃষকদের হাতে ছিল লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র। বিপরীতে সরকারি বাহিনীর হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।
একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ শুরু হলে ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে ব্রজনাথ দাস, কুটুমনি দাস, প্রসন্ন কুমার দাস ও পবিত্র কুমার দাসসহ পাঁচ কৃষক নিহত হন। অমূল্য কুমার দাসও আন্দোলনের ঘটনায় আহত হয়ে পরে নিহত হন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। এর আগে একই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রজনী দাস জমিদারের লাঠিয়ালদের হামলায় নিহত হন। নানকার আন্দোলনের শহীদ হিসেবে তাঁদের ছয়জনের নাম আজও স্মরণ করা হয়।
সংঘর্ষের পর আন্দোলনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং আহত হন আরও কয়েকজন। সানেশ্বর ও উলুউড়ি এলাকায় সরকারি বাহিনীর তৎপরতাও জোরদার করা হয়। তবে রক্তক্ষয়ী এই ঘটনার পর আন্দোলন দমে না গিয়ে বরং আরও বিস্তৃত হয়। বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় নানকার প্রথা বিলুপ্তি ও কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রতিবাদ জোরদার হতে থাকে।
অবশেষে প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৫০ সালে জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত এবং নানকার প্রথা রদ করা হয়। এর ফলে নানকার কৃষকদের দীর্ঘদিনের শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। ঐতিহাসিকভাবে নানকার আন্দোলনকে বৃহত্তর সিলেটের কৃষকদের অধিকার আদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নানকার বিদ্রোহের শহীদদের স্মরণে বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর ও উলুউড়ি গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবছর ১৮ আগস্ট নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবসে সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদদের স্মরণ করা হয়।
এদিকে, আজ সকালে ঐতিহাসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস উপলক্ষে সুনাই নদীর তীরে নানকার বিদ্রোহের শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এ সময় বক্তারা নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এ আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বলেন, নানকার বিদ্রোহ শুধু অতীতের একটি কৃষক আন্দোলন নয়; এটি জমিদারি শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে অধিকার, মর্যাদা এবং ভূমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
সুনাই নদীর তীরে ৭৭ বছর আগে কৃষকদের যে আত্মত্যাগের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা আজও বিয়ানীবাজারের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। প্রতি বছর ১৮ আগস্ট নানকার শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফিরে আসে সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি।